কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানের সম্পর্ক জানার উপায় ꡶ Quran O Adhunik Bigganer Somporko Janar Upai

 

কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানের সম্পর্ক জানার উপায় ꡶ Quran O Adhunik Bigganer Somporko Janar Upai

কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানের সম্পর্ক জানার উপায় ꡶ Quran O Adhunik Bigganer Somporko Janar Upai


আসসালামু আলাইকুম

আমরা একবিংশ শতাব্দীতে বাস করি। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আমরা মোটামুটি একটা অস্থির সময় পার করছি। পৃথিবীর এক প্রান্তে মানুষ মানুষকে নির্বিচারে মেরে ফেলছে, আরেক প্রান্তে মানবতা ও শান্তির পতাকা ওড়ানো হচ্ছে। এই অস্থিরতাকে আরেক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে আস্তিকতা-নাস্তিকতার বিষয়টি। একদল বলছে, সৃষ্টিকর্তা নেই, সবকিছুই প্রকৃতির সৃষ্টি। আরেকদল বলছে, সৃষ্টিকর্তা আছেন এবং প্রকৃতিও তাঁরই সৃষ্টি। দু’দলই তাদের নিজ নিজ যুক্তি নিয়ে খড়গহস্ত। এত কিছুর মধ্যেও প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো নতুন নতুন বিষয়ের সাথে আমাদের পরিচয় হয়। এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে যখন সবকিছুরই প্রমাণ হাতে-কলমে দেওয়া সম্ভব তখন সবচেয়ে ধোঁয়াশা জন্মে ধর্ম ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে আমাদের ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে। বিজ্ঞান কী ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলে? ধর্ম যা বলে, বিজ্ঞান কী তা প্রমাণ করতে পারে না? আমরা কীভাবে এসেছি? মৃত্যুর পর কোথায় যাব? পুনরুত্থান কি আদৌ হবে? অনেক প্রশ্ন প্রতিধ্বনির মত আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসে।

আস্তিকতা-নাস্তিকতা একটি আপেক্ষিক বিষয়। পৃথিবীতে এমন অনেক বড় বড় দার্শনিক আছেন যারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব নেই-এটা প্রমাণ করতে গিয়ে নিজেই সবচেয়ে বড় বিশ্বাসী হয়ে গেছেন। জন্মসূত্রে আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, ইসলাম ধর্মের অনুসারি এবং জাতিতে মুসলমান। আমাদের ধর্মগ্রন্থের নাম পবিত্র কুরআন শরীফ। কুরআন শরীফকে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান বলা হয়। আমাদের জানা-অজানা সকল প্রশ্নের উত্তর এই গ্রন্থে আছে। অনেকেই মনে করেন বিজ্ঞান ও ইসলাম ধর্ম পরস্পর বিরোধী। আসলে তা নয়। বরং যুগে যুগে ধর্ম ও বিজ্ঞান এক অপরকে সহযোগীতা করে আসছে। আমাদের মাঝে অনেকে আছের যারা বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ধর্ম ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধনকে দ্বিধান্বিত করতে চায়। এর মধ্যে অবিশ্বাসীদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো শবে মেরাজ।

মুসলমানদের কাছে শব-ই-মে’রাজ বা মে’রাজের রাত অত্যন্ত ঘটনাবহুল এবং তাৎপর্যপূর্ণ একটি রাত। মেরাজ হল হযরত মহানবী (সা) এর আল্লাহর সাথে দেখা হওয়ার ঘটনা। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে মে’রাজ সংঘটিত হয়। মেরাজকে- আল ঈসর ওয়াল মিরাজ বা দি নাইট জার্নি বলা হয়ে থাকে। এই রাতের দুইটি অংশ আছে। প্রথমে পবিত্র মক্কা নগরীর মাসজিদুল আল হারাম হতে প্রায় ২১১৩ কি. মি দূরে জেরুজালেমের মসজিদুল আল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ এবং পরবর্তীতে আল্লাহ এবং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সহিত দর্শন। মেরাজের পুরো সময় মহানবীর বাহন ছিল বুরাক নামের স্বর্গীয় প্রাণী যা ছিল আলোর তৈরি। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে যখন মেরাজ সংঘটিত হয় তখন অনেকেই এটিকে অলৌকিক এবং মিথ্যা এবং আমাদের প্রিয় নবীকে মিথ্যুক বলে অভিহিত করেছিল। এমনকি আজকের এই আধুনিক বিজ্ঞানের জগতেও তথাকথিত নাস্তিকগণ মেরাজ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। মেরাজ আসলে টাইম ট্রাভেল বা সময় পরিভ্রমণের বাস্তব উদাহরণ।

পবিত্র কুরআনের ১৭ নং সূরা বনী ঈসরাইলের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে- পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আল আকসায়, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বারাকাতময়, তাঁকে তার নিদর্শন দেখানোর জন্য। তিনিই সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা। সুতরাং মেরাজের সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করার কোনো অবকাশই নেই।

অনুমান করা হয়, মেরাজের রাতে হযরত মুহাম্মদ (সা) মে’রাজে জাগতিক হিসেবে ২৭ বছর সময় কাটিয়েছিলেন, যদিও আল্লাহ সর্বজ্ঞ। পৃথিবীর মানুষের কাছে মেরাজের ঘটনাটি কয়েক মূহুর্তের। মেরাজের ব্যাপারটি মনে আসলে আমাদের তিনটি বিষয়ে খটকা লাগে। এক, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) কিভাবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বেড়াজাল ছিন্ন করেছিলেন? দুই, সময় সংক্রান্ত জটিলতা এবং তিন, আল্লাহ ও পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সাথে দেখা হওয়া। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে সংঘটিত হওয়া এই ঘটনার ছেঁড়া সুতোগুলো আমরা বিজ্ঞানের মাধ্যমে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করব।

আমাদের পক্ষে কী পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এড়ানো সম্ভব? আপাত দৃষ্টিতে এটি অসম্ভব মনে হলেও বিংশ শতাব্দীর সত্তর দশকে চাঁদে যাওয়ার মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করেছি, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এড়িয়ে মহাকাশে বিচরণ সম্ভব। বৈজ্ঞানিক অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জানা গিয়েছে যে, যদি পৃথিবী থেকে ঘন্টায় ২৬ হাজার মাইল বেগে কোনো বস্তুকে ছুঁড়ে দেওয়া হয় তাহলে সেই বস্তুটি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এড়িয়ে মহাকাশে বিচরণ করবে। মেরাজের রাতে নবিজীর বাহন ছিল বুরাক যার গতিবেগ আলোর গতিবেগের সমান বা এর থেকেও বেশি। আমরা জানি,আলোর গতি সেকেন্ডে ১৮৬০০ মাইল। সুতরাং বুরাকে উপবিষ্ট মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর ঘন্টায় ২৬০০০ মাইল গতিবেগে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এড়ানো খুব অযৌক্তিক হবে না।

আমরা সবাই আনস্টাইনের আপেক্ষিকতার নীতি কথাটির সাথে পরিচিত। আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার নীতিতে বলেছেন যদি কোনো ব্যক্তি বা বস্তু আলোর গতির ৮৭-৯০ ভাগ গতিতে ভ্রমণ করতে পারেন তাহলে তাঁর ভ্রমণের সময়কাল ৫০ ভাগ পর্যন্ত কমে যায়। আর কোনো বস্তু যদি আলোর গতির সমান বা তার চেয়ে বেশি বেগে ভ্রমণ করতে পারে তাহলে তার সময় হবে শূণ্য অর্থাৎ তার ভ্রমণ করতে জাগতিক হিসেবে কোনো সময়ই লাগবে না।  আমরা জানি,আলোর গতি সেকেন্ডে ১৮৬০০ মাইল। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর মেরাজের বাহন ছিল বুরাক নামের প্রাণী যা ছিল আলোর তৈরি। সুতরাং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর ভ্রমণের গতিবেগ ছিল আলোর গতিবেগের সমান বা এর থেকেও বেশি।

আলোর গতির প্রকৃতি বক্রাকার এবং থেমে থেমে আসে। এর ফলে সম্মুখের সৃষ্টির মাঝে যাবতীয় ক্রিয়াকর্মের রেকর্ড সচিত্র সংরক্ষিত থাকে, অনেকটা ভিডিওচিত্র ধারণের মতো। কেউ যদি আলোর সমপরিমাণ বা তার থেকে বেশি গতিতে মহাবিশ্বে ভ্রমণ করতে পারে তাহলে অতীতের সকল ঘটনা তিনি সচক্ষে দেখতে পাবেন বলে ধারণা করা হয়। সুতরাং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সাথে দেখা হওয়ার ঘটনা একবারেই অসম্ভব নয়।

পবিত্র কুরআন শরীফ আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে আমাদের নবীজী হযরত মুহুম্মদ (স) এর উপর নাযিল হয়েছিল। কুরআনের মত বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ এই পৃথিবীতে আর একটিও নেই। কুরআনে উল্লিখিত অনেক ভবিষ্যৎবাণী বিজ্ঞানিরা বিংশ শতাব্দীতে প্রমাণ করেছেন। পবিত্র কুরআনের ৮৪ নং সূরা আল ইনশিকাক এর প্রথম চার আয়াতে বলা আছে, যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে, এবং ওটা স্বীয় রবের আদেশ পালন করবে, আর ওকে তদুপযোগী করা হবে, এবং পৃথিবীকে যখন সম্প্রসারিত করা হবে, এবং পৃথিবী তার অভ্যন্তরে যা আছে তা বাইরে নিক্ষেপ করবে ও শূন্যগর্ভ হয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা বিংশ শতাব্দীতে প্রমাণ করেছেন, যে একসময় সূর্যের ব্যাসার্ধ বেড়ে যাবে এবং পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহকে গ্রাস করে ফেলবে। পৃথিবীতে কোনো মাধ্যাকর্ষন শক্তি থাকবে না। পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ওলটপালট হয়ে যাবে।

আমরা ইসলাম ধর্মের অনুসারী হওয়ায় পুনরুত্থানে বিশ্বাস করি। অনেকেই বলেন, মৃত্যুই সমাপ্তি। মৃত্যুর পর আর আমরা জেগে উঠব না। আমাদের কঙ্কালকে কীভাবে আবার মানুষ করে তোলা হবে? জেগে উঠলেও কীভাবে এত মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? আমাদের এই পৃথিবীতে প্রায় ৭০০ কোটি লোকের বসবাস। আমরা সবাই মানুষ হওয়া সত্ত্বেও সবাই সবার থেকে আলাদা। একে অপরের থেকে চেহারায় আলাদা, বর্ণে আলাদা। আধুনিক যুগের মানুষ হওয়ার কল্যাণে আমরা সবাই জানি যে আমাদের শরীরের গাঠনিক একক ডি এন এ। ডি এন এ কোড করে এই পৃথিবীতেই প্রাণীদের ক্লোন করা সম্ভব। ক্লোন হলো আমার ডি এন এ কপি করে আমার মতো দেখতে, আমার মতো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আরেকজনকে তৈরি করা। আমাদের মতো ক্ষুদ্র ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ যদি এই পৃথিবীতে বসেই আরেকটা আমাকে বানাতে পারি তাহলে আমাদের যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর পক্ষে কী এই কাজটুকু করা খুব অসম্ভব? সূরা আল-কিয়ামাহ এর ২-৩ আয়াতে বলা হয়েছে- মানুষ কী মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না? বস্তুতঃ আমি তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত পুন:বিন্যস্ত করতে সক্ষম। কুরআন শরীফে উল্লিখিত প্রতিটি আদেশ, নির্দেশ, নিষেধ মানবজাতির কল্যাণে নাযিল হয়েছে।

আমরা আমাদের অজ্ঞতার কারণে বিজ্ঞান ও ধর্মকে একে অপরের থেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু ধর্ম হলো বিশ্বাস, বিজ্ঞান হলো যুক্তি। যদিও যুক্তি কখনই ঈমানের ভিত্তি হতে পারে না, বরং যুক্তির যেখানে শেষ, ঈমান সেখান থেকেই শুরু। যার যার বিশ্বাস তার তার কাছে। মুসলমান হয়ে জন্মে আল্লাহপাকের এত এত নিয়ামত এবং তাঁর রহমতের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে আমরা প্রতিনিয়ত অস্বীকার করছি, অবমাননা করছি। ইসলামের আদেশ-নিষেধকে প্রতিনিয়ত কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছি। একজন শিক্ষিত, যুক্তিবাদী ও আধুনিক মানুষ হিসেবে এই আচরণগুলোই বা আমাদের জন্য কতটা সমীচীন?

কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানের সম্‌পর্ক বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বুঝাতে চেয়েছি যে, মানুষের মধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিধাবোধ কাজ করে। কিছু ইসলাম বিশ্বাসীদের কোন দ্বিধাবোধ কাজ করে না, নিরধিয়া বিশ্বাস করে কুরআনকে। আর বিজ্ঞান বিশ্বাসীদের বিশ্বাস প্রমাণ ও যুক্তি। আসলে আমরা যে আলোচনা করেছি তার মধ্যে কোনো ভুল-ত্রুটি থাকলে তা ক্ষমা  দৃষ্টিতে দেখবেন। 


সংগ্রহে: আনাসটেক বাংলা

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url