শিশুর মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে পিতা-মাতার ভূমিকা ꡶ Role of parents in developing human values ​​of children

 

শিশুর মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে পিতা-মাতার ভূমিকা ꡶ Role of parents in developing human values ​​of children
Role of parents in developing human values ​​of children

শিশুর মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে পিতা-মাতার ভূমিকা

Role of parents in developing human values ​​of children


আসসালামু আলাইকুম

সন্তান হলো একটি পরিবারের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। জীবনের শুরুতেই সন্তান যাদের হাতের স্পর্শ পায়, যাদের  কাছাকাছি থেকে ভুলে যায় সব দুঃখ-কষ্ট, তারা হলেন পিতা-মাতা। পিতা-মাতার হাত ধরেই সন্তান প্রবেশ করে কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে। তাদের কাছ থেকেই শেখে প্রথম শব্দমালা, তাদের হাত ধরেই শুরু হয় প্রথম পথচলা। ফলে পিতা-মাতার কাঁধেই বর্তায় তাদের ছোট্ট সোনামণিকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার সুমহান দায়িত্ব। ইমাম গাজ্জালী (র) বলেন, ‘সন্তান হলো পিতা-মাতার কাছে পবিত্র আমানত’। এ আমানতের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারলে তা পরিণত হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন আদর্শ মানুষ করে গড়ে তুলতে পিতা-মাতার জন্য ইসলামে রয়েছে অসাধারণ দিক নির্দেশনা। 

অনুসরণীয় আদর্শ হই:

শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। যা দেখে তাই করতে চায়। যা শোনে তাই বলতে চায়। ওদের জন্যে আমাদেরকে হতে হবে সর্বোত্তম আদর্শ। আমাদের আদর্শই সন্তানকে দেখাবে তার ভবিষ্যত পথ। তাইতো রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘প্রতিটি আদম সন্তান তার স্বভাবজাত ধর্ম নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাবা-মা তাকে প্রভাবিত করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বানায়।’ (বুখারি: ১২৭০, মুসলিম: ৪৮০৩)। আমরা যাই করি তাই শিশুদের কাছে ভালো কাজ। শিশুদের সামনে ভালো কাজ করাটাই হলো তাদের জন্য উত্তম শিক্ষা।

কর্কশভাষী নয়, সুন্দরভাবে কথা বলি: 

সুন্দরভাবে কথা বলা মানুষের একটি উত্তম গুণ। আল্লাহ তা’য়ালা ও তাঁর রাসুল (স) একে অপরের সাথে সুন্দর করে কথা বলার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তোমরা মানুষের সাথে সুন্দর করে কথা বলো।’ (সূরা আল-বাকারা, ৮৩) রাসুল (স) কখনো কারো সাথে ধমকের সুরে কথা বলেননি। তিনি কথা বলতেন হাসিমুখে এবং হাসিমুখে কথা বলাকে তিনি বলেছেন সাদাকাহ বা পূণ্য। আল্লাহ তা’য়ালা কর্কশভাষীকে গাধার কণ্ঠের সাথে তুলনা করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো, উচ্চস্বরে কথা বলো না; কণ্ঠস্বরকে গাধার মতো কর্কশ করো না।’ (সূরা লুকমান, ১৯)। আমাদেরকে অশ্লীল ও কটু কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এমন কথার দ্বারা সবার আগে প্রভাবিত হয় শিশুরা। আমাদের থেকে শিখে এ কথাগুলো তারা বলে তার বন্ধুদের, খেলার সাথীদের। বিনষ্ট হয় চারপাশের পরিবেশ। তাছাড়া ‘যে ব্যক্তি অশ্লীল ও কটু কথা বলে আল্লাহ তা’য়ালা তাকে ঘৃণা করেন।’ (সুনান আত-তিরমিযী: ৩৬২-৩৬৩)

উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেই: 

সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া পিতা-মাতার কর্তব্য। রাসুল (স) সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়াকে পিতা-মাতার পক্ষ থেকে সন্তানের জন্য সর্বোত্তম উপহার বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া অপেক্ষা আর কোনো ভালো জিনিস উপহার দিতে পারে না।’ (সুনান আত-তিরমিযী: ১৯৫৭)। অনেক সময় আমরা প্রবীণদের সাথে উপহাসমূলক আচরণ করি, তাদের কম গুরুত্ব দিয়ে থাকি। যা অনেক বড় অন্যায়। এতে প্রভাবিত হয়ে শিশুরাও না বুঝে তাদের সাথে একই আচরণ করে বসতে পারে। আমরা বৃদ্ধাবস্থায় সবার কাছ থেকে কেমন আচরণ পাবো তা নির্ভর করে আমরা এখন বৃদ্ধদের সাথে কেমন আচরণ করি তার ওপর। রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘যে যুবক প্রবীণ ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করে, আল্লাহ তার জন্য এমন এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত করবেন, যে তাকে তার প্রবীণ বয়সে সম্মান প্রদর্শন করবে।’ (সুনান আত-তিরমিযী: ১৯৭১)। সুতরাং ছোট-বড় ও সমবয়স্কদের সাথে কেমন আচরণ করবে তা সন্তানকে শেখানো পিতা-মাতার দায়িত্ব।

সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেই: 

পিতামাতার সময়, সাহচর্য ও বন্ধুত্বের সবচেয়ে বেশি অধিকার তার সন্তানের। প্রতিদিন সন্তানকে কিছু সময় দেওয়া, মনের কথা ও সমস্যাগুলো জানা, তার সাথে বৈধ চিত্ত বিনোদন ও খেলাধুলায় সময় কাটানো পিতামাতার দায়িত্ব। 'রাসুল (স) তাঁর প্রিয় দৌহিত্র হাসান ও হুসাইন (রা) এর সাথে খেলাধুলায় লিপ্ত হতেন। তিনি নিজে ঘোড়ার মতো করে নিচু হতেন এবং হাসান ও হুসাইন (রা) তাঁর পিঠে চড়ে খেলা করতেন। রাসুল (স) ততক্ষণ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে খেলা করতেন, যতক্ষণ না হাসান ও হুসাইন (রা) খেলা বন্ধ করতেন'। (মুসতাদরাক আল হাকিম: ৩/১৬৭)। ছোটদের প্রতি আদর, স্নেহ ও ভালোবাসা প্রদর্শনের ব্যাপারে রাসুল (স) ছিলেন সর্বোত্তম আদর্শ। আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, ‘সন্তানসন্ততি ও পরিবারের সদস্যদের  প্রতি স্নেহ দয়া ও মমতা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাসুল (স) এর চেয়ে বেশি কাউকে আমি দেখিনি।’ (মুসলিম: ১২৪১)

ধমক নয়; বুঝিয়ে বলি, প্রহার নয়; আদর করি:

শিশুরা কোমল। এরা কোমলতা প্রিয়। ইসলাম শিশুদের প্রতি মমতাপূর্ণ কোমল হৃদয়ের হতে নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, ‘প্রতিটি বৃক্ষেরই ফল রয়েছে, আর কলিজার ফল হলো সন্তান। আল্লাহ তা’য়ালা ঐ ব্যক্তির প্রতি করুণা করেন না যে তার সন্তানের প্রতি কোমল না। যাঁর হাতে আমার প্রাণ সেই সত্ত্বার শপথ, দয়ার্দ্র ব্যতিত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারি ও মুসলিম)। শিশুকে কোনো অন্যায় করতে দেখলে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে প্রহার করা ঠিক নয়; বরং তাকে ভালোভাবে অন্যায়টি বুঝিয়ে বলা এবং সঠিকটি বলে দেওয়া উচিত। এটাই ছিল রাসুল (স) এর আদর্শ। রাফে ইবনে আমর আল-গিফারি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বাল্যকালে আমি আনসারদের খেজুর গাছে ঢিল ছুড়তাম। অত:পর রাসুল (স) এর কাছে অভিযোগ দেওয়া হলে আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে আসা হয়। তিনি আমাকে বলেন, ওহে বালক! খেজুর গাছে তোমার ঢিল ছোড়ার কারণ কী? আমি বললাম, খেজুর খাই। তিনি বললেন, খেজুর গাছে ঢিল মেরো না, বরং গাছের নিচে এমনিতেই যা পড়ে তা খাও। অতঃপর তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! আপনি এর উদর পূর্ণ করে দিন। (ইমাম তিরমিযী (র) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন)। শিশু কোনো অন্যায় করলে শিশুর ব্যক্তি সত্ত্বার দিকে টার্গেট করে কথা বলা ঠিক নয়। বরং তার কর্ম ও আচরণকে উদ্দেশ্য করে কথা বলা উচিৎ। যেমন: ‘বলা যেতে পারে, এটা একটি মন্দ কাজ অথবা এ জাতীয় অন্য কোন কথা। কখনো তাকে বলবেন না: তুমি একটি মন্দ শিশু অথবা তুমি কোনো ভালো মানুষ নও। কারণ সরাসরি ব্যক্তিত্বের সমালোচনা সাধারণত সৃজনে নয় বিনাশে সহায়ক হয়।’ (ইলমু নাফসীল মারাহিলিল উমরিয়্যাহ- ড. ওমর মুফদা: পৃষ্ঠা ৩৯৩)

শিশুর ব্যক্তিসত্ত্বার স্বীকৃতি দেই: 

শিশুকে মূল্যায়ন ও তার ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি দানে এক অনন্য উদাহরণ ছিলেন রাসুলুল্লাহ (স)। সাহল বিন সা’দ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ (স) এর নিকট এক পেয়ালা দুধ আনা হলে তিনি প্রথমে তা হতে পান করলেন। তাঁর ডান পাশে একটি বালক উপবিষ্ট, যে বয়সে সকলের চেয়ে ছোট। অপরাপর গণ্যমান্য সাহাবায়ে কেরাম তাঁর বাম পাশে অবস্থান করছিলেন। রাসুলুল্লাহ (স) বালকটিকে বললেন, ‘তুমি অনুমতি দিলে আমি আগে বড়দেরকে দিতে পারি?’ উত্তরে সে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল (স), আপনার থেকে আমার প্রাপ্ত অংশের ওপর আমি কাউকে প্রাধান্য দিতে পারি না।’ অতঃপর রাসুলুল্লাহ (স) তাকেই দিলেন। (বুখারি: ২১৯৩, মুসলিম: ৩৭৮৬)। 

উল্লেখ্য যে, বালকটি ছিল ইবনে আব্বাস (রা)। এ হাদীসখানা শিশুর ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি, অধিকারসমূহ সংরক্ষণ এবং তার অনুমতি গ্রহণের ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছে। 

খেলার জন্য ভালো সাথি, ভালো উপকরণ দেই; পর্যবেক্ষণ করি:

সন্তানদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ এবং শক্তি অর্জনের জন্য তাদের শরীরচর্চামূলক খেলাধুলায় ইসলাম উৎসাহিত করেছে। ‘বিশেষত ঘোড়ার পিঠে আরোহণ, সাঁতার কাটা ইত্যাদি।’ (বুখারি: ৩২৩,৩৩৫; মুসলিম: ৬০৯)। বয়সভেদে সন্তানের জন্য উপযুক্ত খেলনার ব্যবস্থা করতে হবে। ‘সাহাবায়ে কিরাম (রা) তাঁদের ছোট সন্তানদের জন্য সুতোর খেলনা পুতুল তৈরি করে দিতেন।’ (বুখারি: ১৮২৪)। রাসুল (স) এর গৃহে ছোটরা সুতোর তৈরি খেলনা পুতুল নিয়ে খেলা করতো; তিনি নিষেধ করতেন না। ‘উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স) আমার নিকট আসলেন যখন আমি খেলনা পুতুল নিয়ে খেলছিলাম। অতঃপর তিনি পর্দা উঠালেন এবং বললেন- ‘হে আয়েশা, এটা কি? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল (স), এটা খেলনা।’ (ইবনে হিব্বান: ১৩/১৭৩)। খেলাধুলার ক্ষেত্রে অবশ্যই শিশুর শারীরিক নিরাপত্তার দিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। কম্পিউটার গেমস, মোবাইল গেমস ও টিভি কার্টুনের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মনিটরের সামনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে শিশু স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং শিশুর সিংহভাগ সময় নষ্ট হয়। এ ছাড়াও শিশু কার সাথে মিশছে তাও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কুরআনুল কারীমে ইউসুফ (আ) এর সঙ্গে তাঁর ভাইদের বর্ণিত ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। ইউসুফ (আ) এর বড় ভাইয়েরা ইউসুফ (আ) কে তাদের সাথে প্রেরণ করার জন্য অনুরোধ করে পিতার নিকট বলেছিলেন, আগামীকাল ইউসুফকে আমাদের সাথে প্রেরণ করুন- সে তৃপ্তিসহ খাবে এবং খেলাধুলা করবে। আর আমরা তার সুরক্ষা দেব। (সুরা ইউসুফ, ১২)। প্রসঙ্গত তার ভাইয়েরা কথা রাখে নি বরং তারা ইউসুফ (আ) কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। সুতরাং শিশুদের জন্য উত্তম খেলার সাথি নির্বাচন করে দিতে পিতা-মাতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

সন্তানের সফলতার জন্য দু’আ করি: 

সন্তান আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এ কামনা প্রত্যেক বাবা-মায়ের। এ জন্য আল্লাহর রহমত সর্বাপেক্ষা প্রয়োজন। সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া আল্লাহ তাআ’লা কবুল করেন। সন্তানের জন্য কী দু’আ করতে হবে তা স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালা শিখিয়েছেন কুরআনুল কারীমে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, যারা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর বানাও এবং সৎকর্মশীলদের জন্য আদর্শস্বরূপ করো। (সুরা আল-ফুরকান, ৭৪)

আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে কীভাবে একটি সন্তান তার জন্মের পর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আদর্শবান সন্তান প্রতিপালন করা। মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সন্তানদেরকে চরিত্রবান, আদর্শ মানবসম্পদে পরিণত করুন। আমিন!


সংগ্রহে: আনাসটেক বাংলা

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url