পাঠকের কান্না ꡶ The reader's cry

 

The reader's cry
The reader's cry

পাঠকের কান্না ꡶ The reader's cry


আসসালামু আলাইকুম

নাম তার ছোটন। সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। ছাত্র হিসেবে সে ছিল দারুণ মেধাবী। তার ছোট্ট সংসারে মা-বাবা ও সে মোট তিন জন। ছোটন তার ক্লাসে প্রথম হয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পা রাখলো। তার বাবা ভ্যান চালায়। স্বল্প আয়ে তাদের মুটোমুটি সংসার চলে যেত। তার বাবা গরীব হলেও ছেলেকে ডাক্তারী পড়ানোর ইচ্ছা। সারাদিন কাজ শেষে ছোটনের জন্য তার বাবা শহর থেকে মজা কিনে আনতো। তার বাবার বাড়ি ফিরতে রাত ১১টা কোনো দিন ১২টাও বেজে যেত। এদিকে ছোটন ঘুমিয়ে পড়তো। বাবা এলে তাকে ঘুম থেকে ডেকে মজা খাওয়াতো। 

সামনে কয়েক মাস বাদে ছোটনের বৃত্তি পরীক্ষা। সবাই জানতো একজন যদি বৃত্তি পায় সে হচ্ছে আমাদের সেই বিনয়ী ছোটন। একদিন ছোটনের মা তাকে ভাত খাওয়াচ্ছে। ছোটন মাকে বলছে- মা আজ আমি বাবা আসলে খাব। মা বলে তোর বাবার আসতে অনেক রাত হবে। যাই হোক খাওয়া শেষে ছোটন মাকে বললো পানি দাও। তার মা ছোটনের জন্য একটি কাচের গ্লাস কিনেছে। আলমারি থেকে বের করে ভালো করে ধুয়ে গ্লাস ভর্তি পানি ছোটনের মুখের দিকে ধরতে গিয়ে হাত থেকে পড়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে চুরমার। এদিকে রাত তখন ১২টা ছোঁয়া ছোঁয়া।

মা’র মনের ভিতর কেমন যেন অস্থির অস্থির ভাব লাগছে। ছোটন বলছে মা গ্লাস ভেঙেছে তো কি হয়েছে? বাবা এলে আবার নতুন গ্লাস কিনলেই হবে। ছোটনরা থাকে এক মফস্বল গ্রামে। যেখানে বাস-ট্রাক যায় না। ছোটনের ইচ্ছা সে ট্রাক দেখবে। এজন্য প্রায়ই তার বাবাকে বলে বাবা আমি তোমার ভ্যানে চড়ে শহরে যাব। সেখানে নাকি বড় বড় গাড়ি-বাড়ি দেখা যায়। 

হঠাৎ তার গ্রামে ট্রাকের শব্দ। ট্রাকটি ঠিক ছোটনের বাড়ির দিকে আসছে। ছোটন তার মাকে বলছে মা দেখ দেখ কী যেন একটা বড় ঘরের মত আমাদের বাড়ির দিকে আসছে। ছোটন বলছে- মা আমার খুব ভয় করছে। তার মা জানতো সেটা ট্রাক কিন্তু ছোটনতো কখনও দেখেনি। মা বলছে- ওরে ছোটন ভয় নেই ওটা ট্রাক। যা দেখার জন্য তুই তোর বাবার কাছে বায়না ধরিস। সত্যি বলছো মা। হুররে... আমি ট্রাক দেখেছি বলতে বলতে ছোটন নাঁচতে শুরু করে দিয়েছে। ছোটনের মা বলে ওরে ছোটন দেখ ট্রাকটি ঠিক আমার ঘরের সামনে এসে থামলো। 

গাড়ির ড্রাইভার এস বললো এটা কি ছোটনদের বাড়ি? ছোটন তখন দৌড়ে বলল-হ্যাঁ আমার বাড়ি। আমাকে ট্রাকে চড়া নিবেন? তখন ড্রাইভার বলল- তোমার মা বাড়ি আছে? ছোটন বলল- হ্যাঁ আঙ্কেল আমি মাকে ডেকে দিচ্ছি। তার মা তখন ঘরের বাইরে এসে বললো কিছু বলবেন? ভাবী- ছোটনের বাবা আজ রাত ১০টায় বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে গুরতর আহত হয় এবং মাথা দিয়ে প্রচন্ড রক্তক্ষরণ হয়েছে। একথা শোনার সাথে সাথে কেমন যেন পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেল। ছোটনের মা বললো মলিন কণ্ঠে....তারপর- ভাবী আমরা তাকে হাসপাতালে নিতে নিতে.........। বলুন কি? কেমন আছে ছোটনের বাবা? ভাবী ভাই আর নেই। ছোটন তার মাকে ধরে জোরে কেঁদে উঠলো বাবা বলে। তার মা তখন পাথর হয়ে গেছে। মুখে তার কোনো কথা নেই। একজন নারীর জীবন তখনই অর্থহীন যখন তার স্বামী মারা যায়। 

৩ মাস পর.....

ছোটনের বৃত্তি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ছোটন তার বাবার চিন্তায় পরীক্ষা ভালো করতে পারেনি। আগামিকাল বৃত্তির ফল বেরুবে। ছোটনের মা আল্লাহর কাছে শুধু একটায় প্রার্থনা করে ছোটনের ফলাফল যেন ভালো হয়। ফল আসলো- ছোটন বৃত্তি পেয়েছে তবে সাধারণ গ্রেডে। তবুও তাদের সংসারে এক চিলতে হাসির ঝলকানি দেখা গেল। কিন্তু তার মা চিন্তা করতে লাগলো। ছোটনকে শত কষ্ট হলেও ডাক্তারি পড়াবো। কারণ এটা ছোটনের বাবার শখ ছিল। ছোটনদের সংসার চালানো অনেক কষ্ট হয়ে যায়। তার মা লোকের বাড়ি ঝিঁ-এর কাজ করে সংসার চালায়। মা ছোটনকে প্রশ্ন করে- আচ্ছা বাবা তুই ডাক্তার হতে পারবিতো? হ্যাঁ মা অবশ্যই পারবো। 

৪ বছর পর.....

ছোটন এস.এস.সি. তে জিপিএ ৫নিয়ে বিজ্ঞান শাখায় পাশ করেছে। তার মা অতি কষ্টের মাঝেও লেখাপড়ার খরচ চালায়। অভাব বুঝতে দেয়না। ছোটনের জন্য তার মা মাসে মাসে ২ থেকে ৩ শত করে টাকা জমাতো। 

২ বছর পর.....

ছোটন আবারও জিপিএ ৫ নিয়ে (H.S.C) তে গোল্ডেনে পাশ করে। গ্রামের লোক তাকে নিয়ে নানা হইচই শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু তার মায়ের মুখটা অনেকটা ভার। ছোটন তার মাকে বলে মা তুমি কাঁদছো কেন? ও কিছু না! আজ তোর বাবা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হত। মা দেখো আমি বাবার কথা রাখবো। একথায় তার মা অনেকটা স্বস্তি পায়। মার বয়স বেড়ে যাচ্ছে সে আর কতইবা কাজ করবে। ছোটন বুঝতে শিখেছে। সে বলে মা তুমি আর লোকের বাড়ি কাজ করবা না। সামনে মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য ছোটন খুব পড়াশোনা করছে।

৬ মাস পর.....

জানা গেল ছোটন (D.M.C) ঢাকা মেডিকেল কলেজ-এ চান্স পেয়েছে। মা এবার খুব খুশি। আমার ছোটন ডাক্তারি পড়বে। কিন্তু সে ভাবছে এত টাকা কোথা থেকে দেব। ছোটন ঢাকা যাবে কিন্তু মা যেতে দিতে চায় না। মা বলে- ওরে ছোটন আমি তোকে ছাড়া কি করে খাবো, ঘুমাবো, থাকবো? মা তুমি একদম চিন্তা করবা না।

ছোটন এখন ঢাকায়.....

তার কাছে সব কিছুই নতুন। শুরু হয় নতুন জীবনের পথচলা। ১ম বর্ষে খুব ভলো ফলাফল করে ছোটন। একদিন রমনা পার্কের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলো কিছু বড়লোকের ছেলেরা কি যেন খাচ্ছে। তারা ডাকলো এই এসো খাবে। ছোটন তার জীবনের প্রথম ভুল মাথায় নিয়ে গেল এবং মাদকদ্রব্য খাওয়া শুরু করে। ১ম দিন তার বমি হয়। আবার কেন জানি ২য় দিন ইচ্ছা হলো এবং খাওয়া শুরু করলো।

৬ মাস পর.....

ছোটন এখন পুরোপুরি মাদকাসক্ত। বাড়িতে অসুস্থ মা ছোটনের চিঠির আশায় অপেক্ষা করে। ছোটন শুধু চিঠিতে বলে মা আমার অনেক টাকা লাগবে। বড়লোকের ছেলেরা আর কত দিন তাকে মাঙনা খাওয়াবে। শুরু হলো তার জিনিসপত্র বেচা-কেনা বই থেকে শুরু করে ছোটন তার ব্যবহারের সবকিছু বিক্রি করে মাদক সেবন করে। আবার মায়ের কাছে চিঠি লিখে মা আমার পরীক্ষার জন্য ৩০ হাজার টাকা লাগবে। গরীব মা এত টাকা পাবে কোথায়? তাছাড়া মায়ের শরীর আর কতইবা কাজ করবে। তার মায়ের শোবার ঘরটা ছাড়া আর কিছুই নেই। মা ভাবে ছোটন ডাক্তার হবে টাকা পাঠাতে হবে। মায়ের ঘরটা ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে টাকা পাঠায় । সেই টাকা দিয়ে ছোটন মাদক খায়। তার মাথায় আর কিছু কাজ করে না। সে নিজেও জানেনা সে ডাক্তারি পড়ছে কিনা? 

৩ মাস পর.....

ছোটনের মা মৃত্যু শয্যায়, কথা বলার মত শক্তি মা’র নেই। দুর সম্পর্কের এক আত্মীয় ছোটনকে ফোন করে বাড়ি নিয়ে আসে। বাড়ি এসে দেখে তার মা উঠানে একটি পাটি পেড়ে শুয়ে আছে কেও খাবার দেয়না। আবার দিলেও খেতে পারে না। এতসব কিছু দেখেও ছোটনের মনে কোনো অনুভূতি নেই। হালকা তার মনে নাড়া দিয়ে উঠলো মা তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাব। নিয়েও গেল। কিন্তু ছোটন এখন ফকিরের চেয়েও ফকির। তার হাতে কানাকড়িও নেই। হাসপাতালের বিছানায় মা শুয়ে আছে। ডাক্তার বলল- রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। তাড়াতাড়ি এই ঔষধ গুলো নিয়ে আসুন। 

ছোটনের মা’র শাড়ীর আঁচলে ৩৫৬ টাকা বাধাঁ ছিল। মা ছোটনের হাত ধরে আঁচলটি কোনো রকমে ধরিয়ে দিল। ছোটন আঁচল থেকে টাকাগুলো খুলে বের হলো ঔষধ আনার উদ্দেশ্যে। ছোটনের মাথায় কোনো কাজ করছে না। তার প্রচন্ড নেশা ধরেছে। হাসপাতালের গেইট পেরুতে না পেরুতেই দেখলো কোয়ার্টারের পিছনে কিছু ছেলে মাদক নিচ্ছে। দৌড়ে গেল ছোটন সেখানে। গিয়ে বললো আমাকে একটু দাওনা। ওরা তখন বললো এটা কিনতে টাকা লেগেছে। টাকা দাও মাল নাও। ছোটন বলল- কত টাকা লাগবে? ওরা বলল ৪০০ টাকা লাগবে। আমার কাছে ৩৫৬ টাকা আছে আর বাকি টাকা পরে দেব। ছোটন যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে মাদক নেশায়। 

অন্যদিকে.....

ছোটনের “মা” আর নড়তে পারছে না। নেই উন্নত সেবা। সেবা থাকলেও নেই ঔষধ। ছোটন অতি আনন্দে মাদক হাতে নিয়ে মুখে দিল ঠিক একই সময়ে ছোটনের গর্ভধারিণী জননী সবাইকে ফাঁকি দিয়ে এই নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় জানালো না ফিরার দেশে।

প্রিয় পাঠক আরও লিখা যেত কিন্তু আমার ভাষাও স্তব্ধ, হাতটা ভারি হয়ে গেছে। যেখানে “মা” নেই সেখানে আর লিখেই বা কি?

  

সংগ্রহে: আনাসটেক বাংলা

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url